ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চবিতে দীর্ঘ হচ্ছে ভুয়া শিক্ষার্থীর তালিকা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 27, 2025 ইং
চবিতে দীর্ঘ হচ্ছে ভুয়া শিক্ষার্থীর তালিকা ছবির ক্যাপশন: চবিতে ভুয়া শিক্ষার্থীর তালিকা আরও দীর্ঘ হচ্ছে
ad728
নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) যেন হয়ে উঠেছে ভুয়া শিক্ষার্থীদের অভয়ারণ্য। নির্দিষ্ট সময় পরপরই বেরিয়ে আসে ভুয়া শিক্ষার্থী শনাক্তের চাঞ্চল্যকর তথ্য। এসব ভুয়া ব্যক্তিরা নানা পরিচয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

জানা যায়, এই ভুয়া ব্যক্তিদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের দ্বারা যৌন হয়রানি ও শ্লীলতাহানির মতো ঘটনাও ঘটছে।

সর্বশেষ বুধবার রাতে মিনহাজ ইসলাম রিফাত নামে এক ভুয়া শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দিতেন। অর্থনীতি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে জিরো পয়েন্ট পুলিশ বক্সে নিয়ে যান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করেন।

আটক মিনহাজ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ‘আর এইচ হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন বলে তার কাছে থাকা পরিচয়পত্র থেকে জানা যায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চবি অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী পরিচয়ে চলাফেরা করছিলেন। এছাড়া শিক্ষার্থী পরিচয়ে তিনি অর্থনীতি বিভাগের নারী শিক্ষার্থীদের নানা কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠাতেন।

এর আগে গত ২০ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কটেজ থেকে কাওসার নামের এক ভুয়া শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। তিনি নিজেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কটেজে থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতেন তিনি। এরপর তাদের দামি জিনিসপত্র চুরি করে পালাতেন। পরে শিক্ষার্থীরা তাকে একটি কটেজ থেকে আটক করেন।

গত বছরের ৩০ মে রাব্বি মিয়া নামে এক ভুয়া শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাশ পরীক্ষা দেওয়ার সময় ধরা পড়েন তিনি। অভিযুক্ত রাব্বি মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুর রব হলে থাকতেন। তিনি শাখা ছাত্রলীগের উপগ্রুপ ‘সিএফসির’ সক্রিয় কর্মী ছিলেন।

জানা যায়, রাব্বি মিয়া ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের (৫৭ ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত ক্লাশ ও পরীক্ষায় অংশ নিতেন। ক্লাশ পরীক্ষা দেওয়ার সময় শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিতে বললে তিনি নিজের নাম ও আইডি নম্বর বলতে পারেননি। পরে তাকে অফিস কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার ভুয়া পরিচয় প্রকাশ পায়।



একই বছরের ২ মে ধরা হয় আরেক প্রতারক নাজিম উদ্দীনকে। তিনি ১২ বছর ধরে ‘আরেফিন কাব্য’ নাম ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলেন। নিজেকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। এ পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। প্রক্টোরিয়াল বডির হাতে ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সার্চ করে জানা যায়, তিনি ‘Arefin Kabbo’ নামে পরিচিত ছিলেন। ছাত্রলীগের উপগ্রুপ ‘৬৯’-এর টি-শার্ট পরে ছবি আপলোড করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ঘটনা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি চবির ছাত্রই নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও এনএসআই কর্মকর্তা পরিচয়ে অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

তারও কয়েক মাস আগে আটক হন আব্দুল কাদের সিয়াম নামের আরেক প্রতারক। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পরিচয় দিয়ে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতেন।

এর আগে আটক হন দিপ্তি মনি নামে আরেক ভুয়া ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি, তবু এক বছর ক্লাশ করেছেন তিনি। সহপাঠীদের সঙ্গে মিশেছেন, ঘুরেছেন এবং ছাত্রলীগের সহায়তায় আবাসিক হলে থেকেছেন। চবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী পরিচয়ে মিশেছিলেন। পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে গিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।

তারও আগে আটক হন মোহাম্মদ মইম। তিনি ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষে আইন বিভাগে জালিয়াতি করে ভর্তি হয়েছিলেন।

একই বিভাগে চাচাকে বাবা ও চাচিকে মা বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন মাহমুদুল হাসান চৌধুরী (শিমুল)। তিনি প্রকৃত পিতা এমদাদুল ইসলাম চৌধুরীর পরিবর্তে মুক্তিযোদ্ধা চাচা মফিজুল ইসলাম চৌধুরী এবং চাচি শামসুন্নাহার চৌধুরীর নাম ব্যবহার করেন। এ মিথ্যা পরিচয়ের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় (FFQ1) তিনি মেধা তালিকায় ৩৮তম হয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন, যেখানে সাধারণ মেধায় তার অবস্থান ছিল ৪৬৫৩তম।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে চবিতে ১০ জনেরও বেশি ভুয়া শিক্ষার্থী শনাক্ত হয়েছে। প্রতি বছরই ভুয়া শিক্ষার্থীর এ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দাবি—এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এসব প্রতারণা কমবে না।

চবি অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সৃজিতা বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই তার (মিনহাজ ইসলাম রিফাত) কথা শুনে আসছি। তিনি আমাদের বিভাগের অনেক মেয়েকে কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠাতেন। আমাদের ব্যাচের শিক্ষার্থী পরিচয় দিতেন। কিন্তু আমি যেহেতু সিআর, সবাইকে চিনি—ফলে বুঝতে পারি তিনি ভুয়া। আজ আমরা তাকে হাতেনাতে ধরেছি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ কানন বলেন, মিনহাজ যে ভুয়া শিক্ষার্থী, তা আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এছাড়া তার কাছে আমরা একটি পরিচয়পত্র পেয়েছি, যেখানে দেখা যায় তিনি একটি হাসপাতালে চাকরি করেন।

তিনি আরও বলেন, ওই ভুয়া শিক্ষার্থী চবির বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। আমরা আশঙ্কা করছি—তিনি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে এসব করছেন। আমরা তাকে নিরাপত্তা দপ্তরে পাঠিয়েছি। এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত ওখান থেকে নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, অনেক ভুয়া শিক্ষার্থী প্রতারণার উদ্দেশ্যে চবির পরিচয় ব্যবহার করে। যদি কোনো ভুয়া শিক্ষার্থীর নাম তালিকায় চলে আসে, সে ক্লাশ-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বা প্রতারণা করে ভর্তি হয়—তবে তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি; কিন্তু কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্তই না থাকে, তবে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা ছাড়া আমাদের করণীয় কিছু নেই।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি