খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের অনাবাদি ও পতিত পাহাড়ি জমিকে অর্থকরী কৃষির আওতায় এনে কৃষকের আয় বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কফি চাষে। দীর্ঘদিনের গবেষণা, জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, নির্বাচন, মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ও উৎপাদন প্রযুক্তি যাচাইয়ের পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি বাংলাদেশে কফির দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে।
গবেষণা-সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বারি কফি-১ (রোবাস্টা) এবং ২০২৫ সালে বারি কফি-২ (অ্যারাবিকা) নামে দুটি জাত দেশের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বারি কফি-২কে দেশের প্রথম উদ্ভাবিত অ্যারাবিকা জাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কফির পাশাপাশি কাজুবাদাম নিয়েও গবেষণা ও জাত উদ্ভাবনের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে গবেষণা অবকাঠামোর বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বারির ওয়েবসাইটেও ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ (বারি অংগ)’ প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়ন কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কফি নিয়ে গবেষণার সূচনা হয় ২০০১ সালে। দীর্ঘ গবেষণায় বিভিন্ন উৎস থেকে কফির জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, নির্বাচন, অগ্রবর্তী লাইন তৈরি, ফলন ও গুণগত মান যাচাই এবং মাঠপর্যায়ে অভিযোজন পরীক্ষা করা হয়। ২০২১ সালেই দেশীয় কফির প্রথম জাত হিসেবে বারি কফি-১ নিয়ে গবেষণার অগ্রগতির খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
গবেষণা শেষে রোবাস্টা ও অ্যারাবিকা এই দুই ধরনের কফির জন্য পাহাড়ি পরিবেশে উপযোগী জাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্ভাবিত বারি কফি-১ ও বারি কফি-২কে দেশের কফি উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গবেষণা-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি কফির চারা কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। এসব চারা রোপণের পর কৃষক পর্যায়ে উৎপাদনের বাস্তব উদাহরণও তৈরি হয়েছে।
নথিতে একটি কৃষক পর্যায়ের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, চারা রোপণের মাধ্যমে একজন কৃষক বছরে প্রায় ৮০০ কেজি কফি উৎপাদন করছেন। উৎপাদিত কফি থেকে স্থানীয়ভাবে পানীয় তৈরি করে বিক্রির মাধ্যমেও আয় করছেন তিনি। নথির হিসাবে, প্রতিদিন ৫০ কাপ কফি ৮০ টাকা দরে বিক্রি করলে দৈনিক বিক্রি দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার টাকা। এতে বোঝা যায়, কফি শুধু বাগানের উৎপাদন নয়; স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রি করা গেলে এর সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
খাগড়াছড়িতে পরীক্ষামূলক চাষের সাফল্যের পর কৃষক পর্যায়ে বারি কফি-১-এর চাষ শুরু হয়েছে এবং উৎপাদিত কফির প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের ব্যবস্থার কথাও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
২০২৫ সালের একটি মাঠভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ির পাহাড়ে পূর্ণবয়স্ক একটি কফি গাছ থেকে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ কেজি কফি বীজ পাওয়া যেতে পারে এবং উৎপাদিত বীজের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। তবে জাত, মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারভেদে দাম পরিবর্তিত হতে পারে।
এই হিসাব অনুযায়ী, সঠিক ব্যবস্থাপনায় একটি বাগানের পরিপক্ব গাছগুলো থেকে কৃষক নিয়মিত আয় করতে পারেন। ফলে পাহাড়ি কৃষিতে কফি দীর্ঘমেয়াদি অর্থকরী ফসল হিসেবে জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গবেষণা-সংশ্লিষ্ট নথিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় এক লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি থাকার কথা উল্লেখ করে এসব জমির উপযোগী অংশে কফি চাষ সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
নথিতে একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, পাহাড়ের অনাবাদি জমির একটি বড় অংশ কফি চাষের আওতায় আনা গেলে বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বর্তমান আয় নয়; বরং সম্ভাব্য আবাদ সম্প্রসারণের ওপর ভিত্তি করে করা একটি হিসাব।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে জমি নির্বাচন, জাত নির্বাচন, চারা উৎপাদন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
কফি চাষের অন্যতম সুবিধা হিসেবে গবেষণা নথিতে বলা হয়েছে, পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছের সঙ্গে companion crop হিসেবে কফি চাষ করা যায়। অর্থাৎ নতুন করে পুরো জমি পরিষ্কার করে শুধু কফির বাগান করার পরিবর্তে বিদ্যমান বাগান ব্যবস্থার মধ্যেও কফি সংযোজন করা সম্ভব।
এতে একই জমি থেকে একাধিক ফসলের আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পাহাড়ের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে কৃষিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, কফি চাষে শুধু চারা রোপণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না। উপযুক্ত জাত ও ক্লোন নির্বাচন, পাহাড়ের মাটি ও উচ্চতা বিবেচনা, ছায়াব্যবস্থা, সঠিক সার প্রয়োগ, প্রয়োজনীয় সেচ বা পানি ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো ফল সংগ্রহ এবং ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর উৎপাদনের মান ও লাভ অনেকটাই নির্ভর করবে।
গবেষণা নথিতেও কফি চাষকে টেকসই ও লাভজনক করতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষক, উদ্যোক্তা ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে পরীক্ষামূলক সাফল্যের পর কফি এখন শুধু গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষক পর্যায়েও বাণিজ্যিকভাবে কফি বাগান গড়ে উঠছে। ২০২৫ সালের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ির পাহাড়ে রোবাস্টা ও অ্যারাবিকার পাশাপাশি দেশীয় উদ্ভাবিত দুই জাতের কফি চাষের কথা উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে বারি কফি-২ চাষকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক খামার গড়ে ওঠার তথ্যও উঠে এসেছে। সেখানে গবেষকরা দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে ড. মো. আলমগীর হোসেন, সাবেক প্রকল্প সমন্বয়কারী পরিচালক ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ড. মো. আব্দুস সাত্তার, প্রকল্প সমন্বয়কারী পরিচালক ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, পাহাড়ি এলাকার অনাবাদি ও পতিত জমিকে উপযুক্ত অর্থকরী ফসলের আওতায় আনা গেলে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আসবে। কফির উৎপাদনের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় পর্যায়েই মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে।
বর্তমানে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে ড. মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, বাংলাদেশে কফির চাহিদা বাড়ছে এবং বর্তমানে দেশের বাজারের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলে একদিকে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব, অন্যদিকে মানসম্মত উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানির পথও তৈরি হতে পারে।
তিনিও আরও বলেন, রপ্তানির জন্য শুধু কফি উৎপাদন যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মানের বীজ, ধারাবাহিক গুণগত মান, সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং নির্ভরযোগ্য বাজারসংযোগ প্রয়োজন।
এ কারণে গবেষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘চারা থেকে কাপ’ পুরো মূল্যশৃঙ্খলা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক কাঁচা কফির ফল বিক্রি করে যাতে সীমিত আয় না করেন, সেজন্য পাহাড়েই কফি শুকানো, বীজ আলাদা করা, রোস্টিং, গ্রাইন্ডিং ও প্যাকেটজাত করার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পাহাড়ে কফি চাষের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি অনাবাদি জমিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে পারে, একই সঙ্গে বিদ্যমান বাগানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে চাষ করা যায়। কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি চারা উৎপাদন, বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন ও পর্যটনকেন্দ্রিক কফি ব্যবসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট