ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রকৃতির ‘দানে’ মানুষের ক্ষতচিহ্ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 5, 2026 ইং
প্রকৃতির ‘দানে’ মানুষের ক্ষতচিহ্ন ছবির ক্যাপশন: প্রকৃতির ‘দানে’ মানুষের ক্ষতচিহ্ন
ad728

নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
প্রকৃতি যেন দুই হাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল চট্টগ্রামকে। একদিকে পাহাড়ের সবুজ ঢেউ, অন্যদিকে কর্ণফুলীর বয়ে চলা জীবনধারা, সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর। দেশের অন্য কোনো নগরী এত বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপহার একসঙ্গে পায়নি। কিন্তু বিশ্ব পরিবেশ দিবসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে প্রকৃতি চট্টগ্রামকে যা দিয়েছে, মানুষ তাকে কী ফিরিয়ে দিয়েছে?
উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। শহরের নদী, খাল, পাহাড়, সমুদ্রতীর আর বাতাসের দিকেই তাকালেই মিলবে তার প্রতিচ্ছবি।

 

পাহাড়শূন্যের পথে : চট্টগ্রামের পরিচয়ের সঙ্গে পাহাড় শব্দটি নিবিড়ভাবে জড়িত। একসময় পাহাড়গুলো ছিল নগরের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ এবং নানা ধরনের দখলে সেই পাহাড়গুলো আজ ক্ষতবিক্ষত।

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামানের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, গত চার দশক আগে চট্টগ্রামে ২০০টির বেশি পাহাড় ছিল, বর্তমানে তার মধ্যে ১২০টির বেশি পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে।

 

অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান সতর্ক করেছেন, পাহাড় ধ্বংসের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকিও। কিন্তু কে শোনেন এই কথা। পাহাড় সাবাড়ের প্রতিযোগিতায় প্রভাবশালীরা যেমন জড়িত তেমনি সরকারি সংস্থাগুলোও পিছিয়ে নেই।

 

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরের ২৬টি পাহাড়ে রয়েছে ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ স্থাপনা। একদিকে পাহাড়ে অবৈধ বসতি ও দখলের পরিমাণ যেমন বাড়ছে তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে পাহাড়ধসে মৃত্যুও। গত দুই দশকে প্রাণ হারিয়েছেন ২০০-র বেশি মানুষ।

 

কর্ণফুলীর কান্না : কর্ণফুলী শুধু নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বন্দরনগরী, বিকশিত হয়েছে শিল্পায়ন ও নগরসভ্যতা। সেই কর্ণফুলীই আজ দূষণ ও দখলের চাপে বিপর্যস্ত।

 

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কর্ণফুলীর অবদান প্রায় ৩৬ শতাংশ। অথচ প্রতিদিন এই নদীতে ফেলা হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার টন কঠিন ও তরল বর্জ্য। গৃহস্থালী বর্জ্য, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য ও পলিথিন সরাসরি মিশছে নদীর জলে।

 

২০১০ সালে প্রকাশিত জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় কর্ণফুলীর জমি দখল করে রেখেছে ২ হাজার ১১২ অবৈধ দখলদার। অন্যদিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষায় নদী দূষণের ৭৯টি স্থান চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৭টিতেই রয়েছে ভয়াবহ দূষণ। শুধু নগরীর ১৯টি খালের মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত নানা ধরনের তরল ও কঠিন বর্জ্য কর্ণফুলী হয়ে মিশছে সমুদ্রে। নদী রক্ষায় বহু প্রতিশ্রুতি, আদালতের নির্দেশনা ও মহাপরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে কর্ণফুলী এখনও দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়াচ্ছে।
খাল দখলে বাড়ছে জলাবদ্ধতা : নগরীতে একটা সময় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩০টি খালের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, দখল ও ভরাটের কারণে এর অর্ধেকেরও বেশি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ৫৭টি খালের অস্তিত্ব রয়েছে। একসময় খালগুলো ছিল নগরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহের পথ, কিন্তু দখল, ভরাট ও বর্জ্য ফেলার কারণে বহু খাল তাদের স্বাভাবিক রূপ হারিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাল পুনরুদ্ধারে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। তবুও ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। এতে স্পষ্ট হয়, শুধু অবকাঠামো নয়, পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রয়োজন রয়েছে।

 

এছাড়া নগরায়নের চাপে কমছে সবুজ, বাড়ছে কংক্রিট। সঙ্গে বাড়ছে বায়ুদূষণও। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের (একিউএলআই) এক দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমান দূষণ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রামের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

 

বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া চট্টগ্রামের বর্তমান পরিবেশগত ও নগর সংকটের পেছনে সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ১৯৯৫ সালে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান এবং পরবর্তী সংশোধিত পরিকল্পনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও হয়নি। পরিকল্পিত নগরায়নের পরিবর্তে অপরিকল্পিত উন্নয়নই নগরীর সংকটকে বাড়িয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বদলে এখনো ম্যানুয়াল ও সুইপারনির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যে বর্জ্য সম্পদে পরিণত হওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ বোঝা ও অভিশাপে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার নামের সঙ্গে ‘সুয়ারেজ অথরিটি’ থাকলেও বাস্তবে এখনো নগরীতে কার্যকর কোনো সুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যার কারণে বৃহত্তম শহরের কোটি মানুষের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদী ও সাগরে গিয়ে পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ‚মিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।’

 

সবমিলিয়ে এক সময়ের প্রাচ্যের রানির মুকুটে আজ যেন শুধুই পাহাড়ের ক্ষত, কর্ণফুলীর কান্না আর খালের হাহাকার! এর থেকে মুক্তির পথও জানা, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা!


নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ