
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় কর্মরত পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার বদলির আদেশ জারির প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁরা নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। বদলির আদেশের পরও তাঁদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এমনকি দীর্ঘদিনেও ছাড়পত্র না দেওয়ায় প্রশাসনিক কাজে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল। এরপরও বদলি কার্যকর না হওয়ায় পুলিশের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বদলির আদেশ পাওয়া পাঁচ কর্মকর্তা হলেন উপপরিদর্শক (এসআই) আকাশ মাহমুদ ফরিদ, এসআই জুয়েল মজুমদার, এসআই সাইদুর রহমান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রুহুল আমিন ভূঁইয়া এবং এসআই পরিতোষ দাশ।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে ওই পাঁচ কর্মকর্তাকে অভ্যন্তরীণভাবে বদলি করা হয়। আদেশ অনুযায়ী আকাশ মাহমুদ ফরিদকে বন্দর থানায়, জুয়েল মজুমদারকে পতেঙ্গা মডেল থানায়, সাইদুর রহমান ও রুহুল আমিন ভূঁইয়াকে ইপিজেড থানায় এবং পরিতোষ দাশকে ডিবি দক্ষিণ বিভাগে বদলি করা হয়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বদলির আদেশের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হয়। তবে এসব কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলির আদেশের পরও তাঁরা কর্ণফুলী থানায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
বদলি কার্যকর না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে গত ৫ জুলাই জারি করা আরেকটি প্রশাসনিক নির্দেশনায়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, অভ্যন্তরীণ বদলির আদেশ পাওয়া কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন পার হলেও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এতে প্রশাসনিক কাজে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
নির্দেশনায় বদলির আদেশ পাওয়া কর্মকর্তাদের ৬ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ছাড়পত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়।
অর্থাৎ, বদলি আদেশ জারির পরও তা বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় দফায় তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও পাঁচ কর্মকর্তার বদলি কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বদলি আদেশের পরও কেন কর্মকর্তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। কার নির্দেশে বা কী প্রশাসনিক কারণে তাঁরা আগের কর্মস্থলে রয়েছেন, সে বিষয়টিও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ প্রশাসনে বদলি শুধু কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও জনবল ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও দীর্ঘদিন তাঁকে আগের কর্মস্থলে রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মতে, বদলি আদেশ বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব হলে এর কারণ প্রশাসনিক নথিতে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত, গুরুতর অভিযোগ বা বিশেষ প্রশাসনিক প্রয়োজন থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বদলি স্থগিত বা পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু আদেশ বহাল রেখে দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন না হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
বদলি আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে ওই কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে। পরে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য লিখিতভাবে আদেশ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘এরপরও যদি তাঁরা ছাড়পত্র না নেন, তাহলে তাঁদের শোকজ নোটিশ দেওয়া হবে। এরপরও ছাড়পত্র না নিলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় তিন মাস ধরে ঝুলে থাকা এই বদলি আদেশ কবে বাস্তবায়ন হবে এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী ছাড়পত্র না নেওয়ার ক্ষেত্রে কারও দায় নির্ধারণ করা হবে কি না। একই সঙ্গে বদলির আদেশের পরও কেন পাঁচ কর্মকর্তা কর্ণফুলী থানায় অবস্থান করছেন, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।