নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশাসনিক দপ্তরে কর্মকর্তাদের পরিবর্তে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একদিকে শিক্ষকরা অ্যাকাডেমিক ও গবেষণার দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে। ফলে অনেক দপ্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবাপ্রদানে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক পদে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি প্রয়োজন হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষা, গবেষণা ও বিভাগীয় প্রশাসনিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এতে বিভিন্ন সেবা পেতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০ টি প্রশাসনিক দপ্তর রয়েছে। এর মধ্যে রেজিস্ট্রার দপ্তর, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, প্রকৌশল দপ্তর, হিসাব নিয়ামক দপ্তর, পরিবহন দপ্তর, পরিকল্পনা দপ্তর, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও নিরাপত্তা দপ্তরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে একসময় কর্মকর্তাদের পরিবর্তে শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্প্রতি রেজিস্ট্রার পদে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও বাকি দপ্তরগুলোতে এখনো শিক্ষকরাই দায়িত্ব পালন করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রশাসনিক পদে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, গবেষণা এবং বিভাগীয় প্রশাসনিক কাজেও ব্যস্ত থাকায় দপ্তরগুলোতে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেন না। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে ঘিরে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক একই সঙ্গে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিক দায়িত্ব সামলানোর কারণে পরীক্ষার ফল প্রকাশ, ফল সংশোধন, নম্বরপত্র প্রস্তুত ও সনদ ইস্যুসহ বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রয়োজনে সেখানে গেলেও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় অনেক কাজ দিনের পর দিন আটকে থাকে। ফলে চাকরি, উচ্চশিক্ষা কিংবা বিদেশে ভর্তির আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সমস্যার মুখে পড়ছেন তারা।
একাধিক শিক্ষার্থী জানান, সময়মতো ফল প্রকাশ বা সনদ না পাওয়ায় অনেকেই চাকরির আবেদন কিংবা উচ্চশিক্ষার সুযোগ হারানোর শঙ্কায় থাকেন। প্রশাসনিক জটিলতায় শিক্ষার্থীদের সময়ের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে।
সম্প্রতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাফিসা সুলতানা কাঁকনের সনদে নামের বানান দুই দফা ভুল হওয়ায় রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি সনদ শাখার অবহেলার কারণে হয়রানির শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, এ ধরনের ভোগান্তি বিচ্ছিন্ন নয়; বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা নিতে গিয়ে অনেকেই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিরভাগ প্রশাসনিক দায়িত্বেই শিক্ষকরা রয়েছে। অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা কোনো জায়গাতেই পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। অনেকেই যথাযথ সময় দিতে না পারার কারণে সেবা প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষার্থীরাই ভোগান্তিতে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রশাসনিক পদগুলোতে অভিজ্ঞ ও স্থায়ী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলে দাপ্তরিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে। একই সঙ্গে শিক্ষকরা শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বেশি সময় দিতে পারবেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে।
তাদের দাবি, যেসব প্রশাসনিক পদ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত, সেসব পদে দ্রুত নিয়মিত কর্মকর্তা নিয়োগ বা দায়িত্ব প্রদান করা প্রয়োজন। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে এবং শিক্ষার্থীরাও দ্রুত ও কার্যকর সেবা পাবেন।
তবে প্রশাসনিক পদে শিক্ষক থাকার বিষয়ে ভিন্ন কথা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের নেতারা। এ বিষয়ে চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, প্রশাসনিক দায়িত্বে দক্ষ শিক্ষকরা থাকা উচিত। কেননা, তারা শিক্ষার্থীদের সিচুয়েশন ভালো করে বুঝতে পারেন। যারা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, তাদের অ্যাকাডেমিক এবং প্রশাসনিক দুই জায়গায়ই আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, যেসব দপ্তরে দায়িত্বে শিক্ষকরা রয়েছেন, তাদের নিয়োগ পূর্ববর্তী প্রশাসন দিয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নির্ভর প্রশাসন। দায়িত্বে শিক্ষকরা থাকলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা তারা ভালো করে বুঝতে পারেন। তবে কোনো দপ্তরের কাজে অবহেলা হলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সফিকুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব সুষ্ঠু এবং যথাযথভাবে পালন করার জন্য শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে। তারা সেটি ভালোভাবে পালন করছে। কয়েকটি দপ্তরে ব্যতিক্রম হতে পারে। ব্যতিক্রম হলে আমরা খতিয়ে দেখব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হাছান মিয়া বলেন, কোনো দপ্তরে কেউ অবহেলা করছে এমন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি৷ এমন অভিযোগ আসলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট