নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আজ সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে, সেটি হলো রাজনীতির মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি। রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ার এবং সমাজ পরিবর্তনের একটি মহৎ মাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ রাজনীতির বড় একটি অংশ পরিণত হয়েছে ক্ষমতা দখল, প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার প্রতিযোগিতায়। ফলে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, কষ্ট এবং বাস্তব সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা চিরকাল বেঁচে থাকে। ইতিহাসে যারা মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন, জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরকেই মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। আর যারা কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেছেন, তারা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছেন। তাই আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার আমরা কি ক্ষমতার রাজনীতি করবো, নাকি মানুষের রাজনীতি করবো?
মানুষের রাজনীতি মানে শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়া নয়। মানুষের রাজনীতি মানে সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, সমাজের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করা। আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটে ভুগছে, বেকার যুবকরা হতাশায় দিন কাটাচ্ছে, সাধারণ যাত্রীরা পরিবহন নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছে এসব সমস্যার সমাধানে রাজনীতিবিদদের কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন নেতা জনগণের কষ্ট নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেন। একজন প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মী কখনো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন না। তিনি মাঠে থাকেন, মানুষের কথা শোনেন, সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু বর্তমানে আমরা এমন এক বাস্তবতা দেখছি, যেখানে অনেকেই রাজনীতিকে সেবার জায়গা হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।
তরুণ সমাজ আজ পরিবর্তন চায়। তারা এমন নেতৃত্ব দেখতে চায়, যারা সত্য কথা বলবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময় পরিবর্তনের অগ্রদূত ছিল। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামে তরুণদের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাই আজও দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণদের মানবিক ও আদর্শিক রাজনীতির দিকে এগিয়ে আসতে হবে।
ক্ষমতার রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করে, কিন্তু মানুষের রাজনীতি মানুষকে একত্রিত করে। ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হয়, কিন্তু মানুষের রাজনীতিতে ভিন্নমতকে সম্মান করা হয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করা। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং গঠনমূলক সমালোচনার চর্চা বাড়াতে হবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নত হয়, যখন সেই রাষ্ট্রের রাজনীতি মানবিক হয়। উন্নয়ন শুধু বড় বড় সেতু, ফ্লাইওভার কিংবা অট্টালিকা নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, মানুষ ন্যায়বিচার পাবে, শিক্ষার সুযোগ বাড়বে, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হবে এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। তাই রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে।
আজকের সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব অনেক বেশি। অনেকেই রাজনীতিকে এখন শুধুমাত্র বক্তব্য, ছবি বা প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষ এখন শুধু কথায় বিশ্বাস করে না, কাজ দেখতে চায়। একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় মাঠের কাজে, মানবিক আচরণে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া জনপ্রিয়তা টেকসই হয় না।
আমরা যদি সত্যিকার অর্থে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের রাজনীতির চরিত্র পরিবর্তন করতে হবে। ক্ষমতা অর্জনের জন্য হানাহানি, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্য, মানবিকতা ও ন্যায়ের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। জনগণকে অবহেলা করে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক নেতাদের আরও সক্রিয় হতে হবে। রাস্তা-ঘাটের সমস্যা, পানি সংকট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা, মাদক ও সন্ত্রাস এসব বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক কর্মীর দায়িত্ব শুধু বক্তব্য দেওয়া নয়; বরং মানুষের সমস্যার বাস্তব সমাধান নিশ্চিত করা।
আমাদের সমাজে এখনো অনেক মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। গরিব মানুষ অনেক সময় তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। একজন প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীর দায়িত্ব হলো সেই অসহায় মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া। রাজনীতি যদি দুর্বল মানুষের আশ্রয়স্থল না হয়, তাহলে সেই রাজনীতির কোনো মূল্য নেই।
আজ দেশে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা বিলাসী জীবন নয়, সাধারণ মানুষের জীবন বুঝতে সক্ষম হবেন। একজন নেতা তখনই বড় হন, যখন তিনি জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন। জনগণের ভালোবাসা অর্জনের জন্য বড় বড় পোস্টার নয়, দরকার সততা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ।
ক্ষমতা মানুষকে অহংকারী করে তুলতে পারে, কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করা একজন নেতাকে মহৎ করে তোলে। তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে আহ্বান থাকবে রাজনীতিকে ঘৃণা নয়, বরং শুদ্ধ ও মানবিক করার দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ রাজনীতি খারাপ নয়, খারাপ হলো রাজনীতির অপব্যবহার।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি তার ওপর। যদি আমরা বিভাজনের রাজনীতি রেখে যাই, তাহলে সমাজে অস্থিরতা বাড়বে। আর যদি আমরা মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনগণমুখী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর।
রাজনীতির আসল শক্তি ক্ষমতায় নয়, মানুষের আস্থায়। একজন নেতা কত বড় পদে আছেন, সেটি বড় বিষয় নয়; বড় বিষয় হলো তিনি মানুষের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন। তাই আসুন, ক্ষমতার রাজনীতি নয় মানুষের রাজনীতি করি। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করি। তাহলেই একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট