নিউজ ডেস্ক | চট্টগ্রাম পোস্ট
তদন্তের জালে আটকা পড়লেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ক্ষমতাধর প্রকৌশলী দম্পতি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা এই দম্পতির বিপুল সম্পদের পাহাড় ও নানা প্রশাসনিক অনিয়মের খবর এবার খতিয়ে দেখছে স্বয়ং মন্ত্রণালয়। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—তদন্ত শুরু হতেই কেন হঠাৎ সপরিবারে মালয়েশিয়া পাড়ি জমানোর হিড়িক পড়লো তাদের?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী ফারজানা মুক্তা। চসিকে এই প্রকৌশলী দম্পতির প্রভাব ও প্রতিপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে এবার আর গুঞ্জন নয়, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
গত ৯ জুলাই মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-২ শাখা থেকে জারি করা এক জরুরি স্মারকে এই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। যেখানে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত শেষ করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
অভিযোগের সূত্রপাত গত ২৫ জুন। চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে মেহেদী চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। সেই আবেদনেই উঠে আসে এই দম্পতির নামে-বেনামে গড়ে ওঠা প্রায় ৫০ কোটি টাকার সাম্রাজ্যের খতিয়ান।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নিজস্ব দামি গাড়ি, বোয়ালখালীতে জমি, সন্তানদের ব্যয়বহুল ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই প্রকৌশলী দম্পতির ক্যারিয়ারের গ্রাফ বেশ নাটকীয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর প্রশাসনিক রদবদলে শাহীন-উল ইসলামকে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আবারও চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন।
সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী, আর সেখান থেকে সরাসরি ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর মতো সর্বোচ্চ পদে বসার এই উল্কাগতির পদোন্নতি নিয়ে চসিকের প্রকৌশলীদের ভেতরেও রয়েছে চরম অসন্তোষ ও চাপা ক্ষোভ।
এদিকে তদন্তের ঠিক আগ মুহূর্তে, অর্থাৎ গত ২৫ জুন চসিকের সংস্থাপন শাখা থেকে পাওয়া এক তথ্যে জানা যায়—তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী উচ্চশিক্ষার দোহাই দিয়ে এক বছরের জন্য মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমতি চেয়েছেন।
তদন্ত শুরু হওয়ার ঠিক এই সন্ধিক্ষণে এসে কেন এই বিদেশ যাত্রার তোড়জোড়? এই প্রশ্ন এখন চসিকের অলিতে-গলিতে। সহকর্মীদের একাংশের আশঙ্কা—আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে এবং অবৈধ সম্পদ রক্ষার উদ্দেশ্যেই কি এই দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব আরিফুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, তদন্তের নির্দেশনার কপি তারা পেয়েছেন। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেহেতু তদন্তাধীন বিষয়, তাই এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একসময়ের দৈনিক ভিত্তিক সাধারণ মাস্টাররোল কর্মচারী থেকে আজ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার এই অবিশ্বাস্য আলাদিনের চেরাগের রহস্য কী? চসিকের সাধারণ কর্মকর্তা ও নগরবাসী এখন তাকিয়ে আছেন মন্ত্রণালয়ের এই তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। এই প্রভাবশালী দম্পতি কি আসলেই নির্দোষ প্রমাণিত হবেন, নাকি দুর্নীতির থলের বিড়াল এবার বেরিয়ে আসবে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট