নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজকে অবৈধভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদের ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার এবং পণ্য আটকে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপতৎপরতা ঠেকাতে বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। একই অভিযানে কর্ণফুলী চ্যানেল ও বহির্নোঙরে অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল বসিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে ২৮ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ২৪ জনকে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের নিরাপদ নৌ–চলাচল নিশ্চিত করতে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজের নিরাপত্তা জোরদার, অননুমোদিত নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল স্থাপন বন্ধে তিনটি নির্দেশনা জারি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের নির্দেশে এ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত পণ্যবাহী জাহাজে বিশেষ করে গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অবৈধভাবে মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধ করা এবং একই সঙ্গে নৌপথে নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব জানিয়েছেন, দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা এবং খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলোর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কোনো অসাধু ব্যক্তি বা চক্র যাতে পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করে রেখে পণ্যের সরবরাহে কৃত্রিম বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে রাখা হচ্ছে।
অভিযানে সন্দেহজনক ও অনিয়মপূর্ণ কার্যক্রম শনাক্ত হলে তা যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ও জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ বন্দর ত্যাগের পর নির্ধারিত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছানো ও খালাসের বিধান রয়েছে। এ বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালন হচ্ছে কিনা, তাও অভিযানে খতিয়ে দেখা হয়। পণ্য পরিবহন ও খালাসে অযথা বিলম্ব, পণ্য আটকে রাখা কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া বহির্নোঙরে অবস্থানরত লাইটার জাহাজ ও মাদার ভেসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে চালকদের প্রযোজ্য নিয়ম ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য অবহিত করা হয়। জাহাজে লোড করা পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথভাবে খালাস ও পরিবহনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কর্ণফুলী চ্যানেল ও বহির্নোঙরে নৌযান তল্লাশি ও যাচাই। এ সময় মূল নেভিগেশনাল চ্যানেলে অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল স্থাপন করে জাহাজ চলাচলে হুমকি ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে ২৮ জনকে আটক করা হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনকে এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বন্দর সচিব জানান, মূল নেভিগেশনাল চ্যানেলে অবৈধ জাল স্থাপন বন্ধে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ সময় স্থানীয়দের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করে জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেলে কোনো ধরনের জাল বা অন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। নেভিগেশনাল সেফটি নিশ্চিত করতে রেডিও চ্যানেল ব্রডকাস্টের মাধ্যমেও সংশ্লিষ্ট নৌযান ও নাবিকদের সতর্ক করা হয়েছে। মূল নেভিগেশনাল ও শিপিং চ্যানেলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি পাইলট ভেসেল, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ও দুটি বোট এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজ ও দুটি বোট অংশ নেয়। বন্দরের নিরাপত্তা ও নৌপথের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি, টহল ও তথ্য আদান–প্রদান আরও জোরদার করা হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অবৈধভাবে মজুদ, ‘ভাসমান গুদাম’ তৈরি, পণ্য আটকে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, নেভিগেশনাল চ্যানেলে অবৈধ জাল স্থাপন কিংবা জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের স্বার্থে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সমন্বিত অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম।
৩ নির্দেশনা : বন্দরসীমায় নিরাপদ নৌ–চলাচল নিশ্চিত করতে তিনটি নির্দেশনা জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিন নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে– (১) চট্টগ্রাম বন্দরসীমা ও বহির্নোঙরে অবস্থানরত সব জাহাজে আইএসপিএস কোড এবং প্রচলিত বন্দর নিরাপত্তা বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। জাহাজ বহির্নোঙরে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে অ্যাঙ্কর ওয়াচসহ ভিএইচএফ চ্যানেল ১৬ এবং ১২–তে মনিটরিং, নিয়মিত ডেক পেট্রোল ও পর্যাপ্ত সিকিউরিটি লাইটিং বজায় রাখতে হবে। পোর্ট কন্ট্রোল–এর পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো অননুমোদিত নৌযান, ফ্রেশ ওয়াটার বার্জ, সার্ভিস বোট বা অন্যান্য নৌযান জাহাজের পাশে ভিড়তে পারবে না। কোনো সন্দেহজনক নৌযান, ব্যক্তি বা নিরাপত্তাজনিত ঘটনা পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে পোর্ট কন্ট্রোল এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে জানাতে হবে।
(২) বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজসমূহে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত ও অনুমোদিত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়াচম্যান বুকিং সেল হতে ওয়াচম্যান নিয়োগের জন্য জাহাজের মাস্টার ও শিপিং এজেন্টকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করা হয়। নিযুক্ত ওয়াচম্যানগণকে জাহাজের নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে।
(৩) চট্টগ্রাম বন্দরসীমা, প্রবেশপথ এবং বহির্নোঙর এলাকায় অবৈধভাবে মাছ ধরা, মাছ ধরার জাল স্থাপন অথবা ফিশিং বোটের মাধ্যমে নৌ–চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এ ধরনের কার্যকলাপ জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার জন্য তীব্র ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট