প্রবীর সুমন // খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
চলতি আমন মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও বন্যা না থাকায় খাগড়াছড়িতে বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ধানের ভালো উৎপাদন হলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষকরা। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
মাঠজুড়ে এখন পাকা ধানের সুবাস। কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ধান কাটা ও মাড়াইয়ে। সমতল ভূমিতে আশানুরূপ ফলন হলেও ধানের দর কমে যাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসির পরিবর্তে দেখা দিয়েছে চিন্তার ভাঁজ।
কৃষকদের অভিযোগ, ধানের বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে। এতে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১ হাজার টাকারও বেশি। অথচ বাজারে প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৮শ থেকে ৯শ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না অনেকের। যারা খাজনা চাষ করেছে, তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
দীঘিনালার কবাখালীর কৃষক সামশুল আলম বলেন, এবছর বর্গা নিয়ে ৫ কানি জমিনের ধান চাষ করে প্রতি কানিতে ২০-২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, ইতি মধ্যে ২কানি জমিনের ধান কেটেছি এতে ৩৬মন ধান পেয়েছি, বাজার দর অনুযায়ী দুই কানিতে ১০-১২ হাজার টাকা ক্ষতি হবে। এভাবে চললে আগামী বছর আর চাষ করতে পারবো না।
কৃষক রাজেশ চাকমা বলেন, এবছর বন্যা না হওয়ার কারণে ধানের ভালো ফলন হয়েছে পরিবারের লোকজন নিয়ে খেটে যে ধান পেয়েছি বাজার দরের কারণে লাভ তো দূরের কথা পরিশ্রমের টাকাও তুলতে পারবোনা।
কৃষক অমল ত্রিপুরা বলেন, “যে হারে ফসল হয়েছে, সে হারে দাম পাচ্ছি না। উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। দাম না পেলে তো চাষাবাদ করে লাভ নেই। আগামী বছর অনেকেই আবাদ কমিয়ে দেবে।”
এই নিয়ে জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, মৌসুমের শুরুতে ধানের যোগান বেশি থাকায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে কিছুদিন পর বাজার স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ বছর খাগড়াছড়িতে ২৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চাষ হয়েছে ২৯ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৫ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক আদুই রঞ্জন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে খাদ্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি। অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ধান ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু হবে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “এবছর ফলন ভালো হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে প্রচুর ধান উঠায় দাম কিছুটা কম। কৃষকরা যদি ধান শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন, মাস দুয়েক পর ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন।”
তবে কৃষকরা বলছেন, বাম্পার ফলনের পরও ধানের দাম না পাওয়ায় আমাদের মনে শঙ্কা, যদি সরকার দ্রুত ন্যায্য দামে ধান ক্রয় না করে, তবে আগামী মৌসুমে তারা আমন চাষে আগ্রহ হারাবেন। কৃষকেরা আরও বলছেন, “ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে, এই সোনালী ফসল একদিন তাদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।”
কৃষকরা আশাবাদী সরকারি উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে ও বাজার স্থিতিশীল হলে হয়তো ফের দেখা যাবে কৃষকের মুখে সেই চিরচেনা হাসি, যে হাসি মাঠজুড়ে ছড়িয়ে দেয় সোনালী ধানের সুবাস।
কৃষকদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত ন্যায্য দামে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু করলে কিছুটা হলেও তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠবে। অন্যথায় এ অঞ্চলে আগামী মৌসুমে আমন চাষে আগ্রহ হারাবে অনেক কৃষক।

দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট