ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কর্ণফুলীতে সন্ধ্যায় দোকান থেকে তুলে রাতে ‘ডাকাতি প্রস্তুতি’ মামলা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 8, 2026 ইং
কর্ণফুলীতে সন্ধ্যায় দোকান থেকে তুলে রাতে ‘ডাকাতি প্রস্তুতি’ মামলা ছবির ক্যাপশন: কর্ণফুলীতে সন্ধ্যায় দোকান থেকে তুলে রাতে ‘ডাকাতি প্রস্তুতি’ মামলা
ad728


নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় এক যুবককে সন্ধ্যায় চায়ের দোকান থেকে আটক করে কয়েক ঘণ্টা পর ডাকাতি প্রস্তুতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত এবং এতে থানার কয়েকজন সোর্স ও পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আমির বাপের বাড়ি এলাকার বাসিন্দা মুরাদ উদ্দিন (২৫)-কে গত ৪ জুন বিকেলে ‘গাড়ি দেখানোর’ কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান থানার কথিত সোর্স রাকিব ও আজাদ। পরে তাকে খুইদ্দারটেক এলাকার ওসমান ওরশ বিরিয়ানির দোকানের পাশের এইচটি কনভেনশন হল সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে একটি সিএনজি অটোরিকশাযোগে সেখানে উপস্থিত হন কর্ণফুলী থানার এসআই (নিঃ) নূরে আলম সিদ্দিক। তার সঙ্গে ছিলেন এসআই মাহিন সরওয়ার, এসআই মো. রেজাউল হোছাইন, এসআই আরিফুল ইসলাম, এএসআই মো. নুরুল আমিন ও এএসআই মো. শাকিল আহাম্মেদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সোর্স রাকিব ও আজাদ মুরাদকে দেখিয়ে বলেন, “স্যার, ওই হচ্ছে মুরাদ।” এরপর কোনো কারণ ব্যাখ্যা না করেই তাকে সিএনজিতে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্তত ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি পুরো বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন বলে জানা গেছে।

তবে পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহারে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, ৫ জুন রাত ১১টা ৫০ মিনিটে মইজ্জ্যারটেক এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, খুইদ্দারটেক এলাকায় ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবর পেয়ে বিষয়টি অফিসার ইনচার্জকে অবহিত করে পুলিশ রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করলে অভিযান চালিয়ে মুরাদ উদ্দিন ও নূর কামাল নামে দুইজনকে আটক করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় আরও দাবি করা হয়েছে, মুরাদের কাছ থেকে একটি স্টিলের টিপছুরি ও একটি ধারালো খুর উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে নূর কামালের কাছ থেকে একটি স্টিলের ছুরি জব্দ করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয়দের বক্তব্য ও মামলার বর্ণনার মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, ওসমান ওরশ বিরিয়ানির দোকানসহ আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে এবং পুরো এলাকা আলোকিত ও জনবহুল থাকে। এছাড়া সড়কটিতে সার্বক্ষণিক যানবাহন চলাচল করে। এমন পরিস্থিতিতে ‘অন্ধকারের সুযোগে’ ১০ থেকে ১২ জনের পালিয়ে যাওয়ার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে সন্ধ্যার দিকে চায়ের দোকান এলাকা থেকে মুরাদকে সিএনজিতে তুলে নেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফুটেজে কথিত সোর্স রাকিব, আজাদুর রহমান এবং এএসআই নুরুল আমিনকে উপস্থিত দেখা যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মুরাদের মা জাহানারা বেগম বলেন, “আমার ছেলের বিরুদ্ধে আগে কখনো কোনো মামলা বা থানায় অভিযোগ ছিল না। তাকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পরে জানতে পারি, তার বিরুদ্ধে ডাকাতি প্রস্তুতির মামলা দেওয়া হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ। আমার ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মুরাদের এক বন্ধু জানান, ৪ জুন বিকেল ৫টার দিকে তিনি, মুরাদ, সিফাত ও আরফাত এইচটি কনভেনশন হলের পাশের চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে এসে উপস্থিত হন। পরে জানতে পারেন তারা কর্ণফুলী থানার পুলিশ সদস্য। এ সময় রাকিব ও আজাদুর রহমান পুলিশকে উদ্দেশ করে বলেন, “স্যার, এটাই মুরাদ।” এরপর সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটের দিকে তাদের সামনেই পুলিশ মুরাদকে নিয়ে যায়। পরদিন তিনি জানতে পারেন, মুরাদকে ডাকাতি প্রস্তুতি মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সবুজ ও মো. হারুন জানান, তারা কাজ শেষে দাওয়াত দিতে যাওয়ার জন্য মুরাদকে খুঁজছিলেন। তখন মুরাদ তাদের জানান, তিনি চায়ের দোকানে অবস্থান করছেন। পরে ফিরে এসে তারা জানতে পারেন, সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটের দিকে পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে গেছে। তবে আটকের কারণ সম্পর্কে কাউকে কিছু জানানো হয়নি।

তাদের অভিযোগ, থানায় গিয়ে মুরাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে মুরাদের বড় ভাইকে জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে ৮৮ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে দ্রুত জামিন পাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু পরে তারা জানতে পারেন, স্থানীয় ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই মুরাদকে টার্গেট করা হয়েছে। এমনকি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাকে গুরুতর মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

খুইদ্দারটেক এলাকার ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন বলেন, “রাত ৮টার দিকে জানতে পারি, সিভিল পোশাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে চায়ের দোকান থেকে মুরাদকে আটক করে নিয়ে গেছেন। আটকের সময় তার কাছ থেকে কোনো ধরনের অস্ত্র বা অবৈধ বস্তু উদ্ধার করা হয়নি।”

এদিকে মামলার অপর আসামি নূর কামাল ওরফে সাকিবকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে সৈন্যাটেক এলাকায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পুলিশ তাকে আটক করে। এ সময় তার কাছ থেকে একটি গাঁজার প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

মামলার এজাহারে নূর কামালের কাছ থেকে নয় ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি স্টিলের ছুরি উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দা, স্বজন ও দোকানদারদের বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। তাদের দাবি, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাকে আটক করে থানায় নেওয়া হয় এবং রাত ১২টার দিকে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়।

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং মামলার নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে সিএমপির বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। আপনার কাছ থেকে এখন শুনলাম। কোনো পুলিশ সদস্য যদি অতি উৎসাহী হয়ে কাউকে ভিক্টিমাইজ করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, “কোনো নিরীহ বা নিরপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে—এমন অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি