নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
বিগত বছরগুলোর ভয়াবহতা কাটিয়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বীর প্রসবিনী চট্টগ্রাম। যেখানে একসময় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজারেরও ওপরে, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ১০৯ জনে! চট্টগ্রামের এই বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক মডেল এখন জাতীয় অঙ্গনেও ইতিবাচক আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। আর এই সাফল্যকে টেকসই করতে এবং মশার উৎসস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করতে প্রয়োজন সর্বস্তরের অংশীজন ও সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সামাজিক আন্দোলন।
আজ (শনিবার) চট্টগ্রামে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক এক বর্ণাঢ্য নাগরিক সভা ও র্যালিতে বক্তারা এসব তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গসংস্থা ও বৈশ্বিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত প্রাক্তন কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত নবীন সামাজিক সংগঠন সুরক্ষা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সহযোগিতায় এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবিক ও উন্নয়নমূলক কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে চট্টগ্রামের মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে এটিই ছিল ‘সুরক্ষা’র প্রথম আনুষ্ঠানিক ও সফল কর্মসূচি।
‘সুরক্ষা’র চেয়ারম্যান ডাঃ এম এম তৈমুর হাসান-এর সভাপতিত্বে ইঞ্জিনিয়ার শাখাওয়াত হোসেন শাহীন হায়াত ও ডাঃ লামিয়া ইবতেসাম ওসমানের যৌথ সঞ্চালনায় নগরীর এক মিলনায়তনে আয়োজিত এই নাগরিক সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তাঁর সাম্প্রতিক বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, "ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা চিরাচরিত বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘বিটিআই’ (BTI) নামক জৈবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধনে আমাদের ক্রাশ প্রোগ্রাম ও কঠোর মনিটরিং চলছে, যার ফলশ্রুতিতেই আক্রান্তের গ্রাফ আজ ৯ হাজার থেকে মাত্র ১০৯-এ নেমে এসেছে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। নগরবাসী যদি নিজ নিজ আঙিনা, ছাদবাগান বা এসি-ফ্রিজের ট্রে পরিষ্কার না রাখেন, তবে এককভাবে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে মশা শতভাগ নির্মূল করা অসম্ভব। ‘সুরক্ষা’র মতো পেশাদার ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো জনসচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে এলে এই লড়াই আরও বেগবান হবে।"
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুরক্ষার অন্যতম উদ্যোক্তা ডাঃ রাশেদুজ্জামান মন্ডল ও আরমান আলী। বক্তারা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থায় কাজ করার বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, "যেকোনো মহামারী বা স্বাস্থ্যঝুঁকি রুখতে ‘প্রিভেন্টিভ মেজারস’ বা আগাম প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম—এই দর্শনকে ধারণ করে সুরক্ষার লক্ষ্য হলো প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় সচেতনতা পৌঁছে দেওয়া এবং স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করা।"
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ডেঙ্গুর বর্তমান জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার নানা দিক তুলে ধরেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন (জেলার প্রধান স্বাস্থ্য প্রতিনিধি) ডাঃ জাহাঙ্গীর আলম। কারিগরি ও পরিবেশগত শিক্ষার আলোকেই তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের এই সচেতনতা কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এনভায়রনমেন্ট অনুষদের ডিপার্টমেন্ট হেড সেলিম উদ্দিন।
চসিক-এর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের মাঠপর্যায়ের সমন্বয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আলোকপাত করেন চসিক-এর প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ মোহাম্মদ ইমাম হোসেন (রানা)।
গণমাধ্যম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সচেতনতা সৃষ্টি ও গুজব ছড়ানো রোধে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিএমইউজে)-এর সভাপতি ও বাসস (BSS) চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান মোহাম্মাদ শাহনওয়াজ। এছাড়া যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তার বিশাল নেটওয়ার্ক ও ভলান্টিয়ার টিম নিয়ে সুরক্ষার পাশে থাকার আশ্বাস দেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS) চট্টগ্রাম সিটি ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম বাকি মাসুদ। বিশিষ্ট সমাজসেবক শিক্ষা অনুরাগী হাজী জাকির, সভাপতির বক্তব্যে সুরক্ষার চেয়ারম্যান এম এম তৈমুর হাসান উপস্থিত সকল অতিথি, অংশীজন এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সুরক্ষার এই সামাজিক ও নাগরিক আন্দোলন শুধু একদিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ডেঙ্গুমুক্ত নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়তে আগামীতেও মাঠপর্যায়ে তা অব্যাহত থাকবে।
সভায় অন্যানের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন জেড এম সাজ্জাদুল ইসলাম, হাজী সাইফুল আলম, সামাজিক সংগঠন ধ্রুবতারার সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাসুদুল ইসলাম রাসুদ, তরুণ পরিবেশ গবেষক জুয়েল মজুমদার, সীড বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহিদ ইমাম খান সারাত, ক্রীড়া সংগঠক অনিক খানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।
নাগরিক সভা শেষে অতিথিবৃন্দ, সুরক্ষার কর্মী ও শিক্ষার্থীদের যৌথ অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র্যালি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র্যালি থেকে সাধারণ নগরবাসীর মাঝে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সংবলিত লিফলেট ও নির্দেশিকা বিতরণ করা হয়। আগামী এক মাস সুরক্ষা এবং চসিকের যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানায় ক্যাম্পেইন চলমান থাকবে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট