নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ২৬৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানে এবার ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) শীর্ষ কর্মকর্তাদের তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
চট্টগ্রামভিত্তিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নাজমুল আবেদীন ও তাঁর মালিকানাধীন তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এবার ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির তথ্য পেয়েছে দুদক। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইবিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ শীর্ষ পর্যায়ের নয় কর্মকর্তাকে তলব করেছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ থেকে ইস্টার্ন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে পৃথক তলবি নোটিশ জারি করা হয়। দুদকের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুই সদস্যের অনুসন্ধান দল অভিযোগটি অনুসন্ধান করছে। পৃথক নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আজ ৭ সেপ্টেম্বর ও আগামী ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য বলা হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্রসহ উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদানে ব্যর্থ হলে বর্ণিত বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো বক্তব্য নেই বলে গণ্য করা হবে।
এদেরমধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার সিনিয়র রিলেশনশিপ ম্যানেজার সঞ্জয় দাস, ইউনিট হেড (অ্যাসেট টিম-২) আহসান জামান চৌধুরী, এরিয়া হেড (করপোরেট ব্যাংকিং) মো. খুরশেদ উল আলম এবং সিনিয়র ম্যানেজার (ক্রেডিট এডমিন) মেহের ফারজানাকে আজ দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এসোসিয়েট ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন সুমন, হেড অব করপোরেট রিস্ক উসমান রাশেদ মুয়ীন, হেড অব ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট আবুল মাকসুদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী রেজা ইফতেখারকে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর হাজির হতে বলা হয়েছে। এরবাইরে প্রধান কার্যালয়ের ডিএমডি-করপোরেট ব্যাংকিং মো. ফখরুল আলমকেও গতকাল ৬ সেপ্টেম্বর হাজির হতে বলা হলেও তিনি এ দিন উপস্থিত হননি বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২ এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘অনুসন্ধানে অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের তলব করা হয়েছে।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি এ কর্মকর্তা।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, এএন্ডবি আউটওয়্যার লিমিটেড, নর্ম আউটফিট লিমিটেড ও কোল্ড প্লে স্কুল প্রোডাক্ট লিমিটেডের প্রকৃত সুবিধাভোগী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল আবেদীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঋণের একটি অংশ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করছে দুদক। বিষয়টি নিয়ে দুদকের দুই সদস্যের একটি টিম কাজ করছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি ঋণের অর্থের ব্যবহার ও পরবর্তী লেনদেনেও অনিয়ম করা হয়েছে। এরমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া, আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগটি অনুসন্ধান করছে দুদক। এরই অংশ হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সেই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এঅ্যান্ডবি আউটওয়্যার লিমিটেড, নর্ম আউটফিট লিমিটেড ও কোল্ড প্লে স্কুল প্রোডাক্ট লিমিটেড চট্টগ্রাম ইপিজেডকেন্দ্রিক পোশাক রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিন প্রতিষ্ঠানেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নাজমুল আবেদীনের নাম রয়েছে। পাওনাদার ব্যাংকের নথিতে নর্ম আউটফিট লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর শ্বশুর একেএম জাহিদ হোসেন সিদ্দিকী এবং পরিচালক হিসেবে তাঁর স্ত্রীর নামও রয়েছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের টাকাও আত্মসাৎ-দুদকের মামলা : নাজমুল আবেদীনের বিরুদ্ধে ব্যাংকঋণ জালিয়াতির অভিযোগ এর আগেও দুদকের মামলায় গড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নর্ম আউটফিট এন্ড একসেসরিজ লিমিটেডের ঋণ ও আমদানি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, জাল দলিল ব্যবহার করে বন্ড সুবিধায় ২২ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ৩৪২ টাকার কাঁচামাল আমদানির অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে ৭ কোটি ১৪ লাখ ১৩ হাজার ১১২ টাকা মানি লন্ডারিং এবং এতে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
ওই মামলায় নাজমুল আবেদীনের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সোহেলা আবেদীন ও একেএম জাহিদ হোসেন ছাড়াও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং কাস্টমসের সাবেক কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়। জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলাটি করা হয়।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট